আমার যখন ৯ বছর তখন আমি ক্লাস থ্রিতে ছিলাম

 

আমার যখন সাড়ে ছয় বছর বয়স তখন আমি কেজি পাস করেই ক্লাস ওয়ানের জন্য ভর্তি পরীক্ষা দেই। ওই বছরই আমি সাত বছরে পা দিবো। আমার মনে আছে আমি আর আমার খালাতো বোন একে অপরের খাতায় চাওয়া-চাওয়ি করেছি আর কিছুই বুঝি নাই। এখন গল্প শুনি আমরা নাকি সেই ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করতে করতে পাস করে গিয়েছি। তখন আমরা বুঝিই নাই পরীক্ষা কি আর এডমিশন টেস্ট কেমন করে বুঝবো? আমাদেরকে বাপ-মা সিটে বসায় দিয়ে গেছে আর আমরা আচানক প্রশ্ন দেখে সেই বয়সে বিষম খেয়েছি। আর এতো কঠিন পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে অ-তে ওই অজগর আসছে তেড়ে, আ-তে ঐ আমাটি খাবো পেড়ে ইত্যাদি পড়া দেখে চক্ষে সরষে ফুল দেখে প্রফুল্ল হয়েছি। যাক বাবা, সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছিলো তাই ভর্তি পরীক্ষা বাতিল হলো। এখনকার বাপ-মা আর আন্ডা বাচ্চা-কাচ্চারা শান্তি পেলো।

 

আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি আমাদের একটা ম্যাডাম ছিলো তাসকিনা ম্যাডাম। তিনি গানে সাবিনা ইয়াসমিনের মতো সুমধুর হলেও তিনি যেমন স্বাস্থ্যবান ছিলেন তেমনি হুঙ্কার দিতেন। ভয়ে মনে হতো ক্লাস ছেড়ে পালাই। তিনি লন্ডনে যাবার আগ পর্যন্ত তার কাছ থেকে আমরা সব ছত্রীরা ক্লাস এইট পর্যন্ত গান শিখেছি, পড়া না পেড়ে ভ্যাবলার মতো বেঞ্চে কান ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি, আবার উনার যত্নে পড়া পেড়ে ক্লাসে স্মার্ট হয়েছি। তো ক্লাস টুতে একদিনের কথা। আমদের প্রথম বার্ষিক পরীক্ষার প্রথম পরীক্ষা ইংরেজি। আল্লাহর রহমতে আমি ইংরেজিতে পিএইচডি না হলেও ভালো ছিলাম ইংরেজিতে। প্রথম পরীক্ষায় তাসকিনা ম্যাডাম। কিছুই বুঝি না, তবুও সিট খুঁজে বের করে বসেছি। প্রশ্ন দেখে আমি বুঝিই নাই যে আমাকে খাতায় উত্তর করতে হবে। আমি ৭ না ৮ মার্কস এর উত্তর করে বসে ছিলাম। আমি সব পারতাম কিন্তু প্রশ্ন আমি কিছুই বুঝি নাই। পরে যথারীতি বেল পড়ে গেছে আর উত্তর পত্র ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। আর আমি কি হয়েছে কিছুটা আঁচ করতে পেরে ভ্যা-ভ্যা করে কান্না। আমি কিছুই লিখি নাই! এরপরে বিজ্ঞান পরীক্ষায় খুব ভালো পরীক্ষা দিলাম। এইদিনও পড়েছে তাসকিনা ম্যাডাম। দেখলাম কিছু আপু খাতা নিয়ে গিয়ে ম্যাডামকে দিয়ে সাইন করিয়ে আবার খাতা নিয়ে সিটে বসছে। আমারও তো তাই করতে হবে। আমিও খাতা নিয়ে সাইন করিয়ে খাতা ফাইলে ভরে পরীক্ষা শেষে রওয়ানা দিলাম। আমার মন ভালো পরীক্ষা ভালো হয়েছে, খাতাও সাইন হয়েছে, আবার খাতা নিয়ে চলেও এসেছি। আপুরা যে খাতা দেখিয়ে লুজ শিট নিয়ে যাচ্ছে এটা বুঝবো কেমন করে, আর আমি খাতা নিয়ে চলে যাবো এটা ম্যাডামই বা বুঝবেন কেমন করে। পরীক্ষা ভালো হয়েছে, অঙ্ক পরীক্ষায় গ্যাপ আছে, খেলনা কিনেছি, মন ভালো। আম্মু গাড়িতে আমাদের দুইবোনকে রেখে আব্বুর অফিসে কাজে গেলে আমি আমার ছোটো বোনকে বলতে লাগলাম পরীক্ষা ভালো দিয়েছি, আর খাতা দেখিয়ে বলতে লাগলাম ম্যাডাম খাতা ফেরত দিয়েছে। আম্মু এসে এটা দেখে চখু চড়ক গাছ। আমি আম্মুকে বুঝাতে  লাগলাম আজকে ম্যাডাম সবাইকে খাতা ফেরত দিয়েছে। আম্মু আবার আমাদেরকে নিয়ে দৌড়। তখন দুইটা বেজে গেছে। গিয়ে দেখি আমার জন্য তাসকিনা ম্যাডামের হাই প্রেসার উঠে গেছে, আমি না গেলে হার্ট এটাক করতেন। ম্যাডাম তো কাহিনি শুনে বললেন আমি একটা গাধা! লুজ শিট নিয়ে যাওয়াকে আমি খাতা নিয়ে যাওয়া মনে করেছি। অঙ্কের নাসরিন ম্যাডাম বলতে লাগলেন, আমি এমনিতেই ক্লাসে একটাও অঙ্ক পারি না, তার উপর তাসকিনা ম্যাডামকে অসুস্থ বানায় ফেলছি! তাসকিনা ম্যাডাম বলতে লাগলেন তিনি আরেকটা খাতা খুঁজতে খুঁজতে পাগল, তার খাতার হিসাব মিলে না, তার চাকরি যাবে এই ভয়ে যখন তার হার্ট এটাকের অবস্থা তখন আমি খাতা নিয়ে এসেছি। আম্মু বলছে আমি আর কখনো এমন বোকার মতো করবো কিনা, ম্যাডামরা বলছেন আমি এই খাতা নতুন করে লিখে এনেছি কিনা তখন আমার ছোটো বোন ভ্যা-ভ্যা করে কেঁদে দিয়ে বলল, ‘আমার বোন কিছু করে নাই, আমার বোনের খাতাটা নেন।’ বোনের কান্না দেখে আমিও কান্না শুরু করে দিলাম, আমাদের দুইবোনের গলা ধরে কান্না দেখে ম্যাডাম বুঝলেন আমি বুঝি নাই খাতায় না লুজ শিটে সাইন করায়ে মেয়েরা খাতা জমা দিয়েছে, আর ম্যাডামও বুঝে নাই কোনো ছাত্রী এই ব্যাপারটা না বুঝে খাতাই নিয়ে যাবে। ম্যাডাম আমার খাতা জমা নিলেন। এরপর আমি বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো করলাম বটে।

আমার যখন ৯ বছর তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। ক্লাস থ্রি মানে তৃতীয় শ্রেণি। আম্মু আমাকে স্বর্ণের রঙ করা এক জোড়া ছোটো ঝুমকা মতোন  কিনে দিলো। আমি মনের সুখে ঝুমকা কানে ক্লাসে গেলাম। সবাই বলল দুল জোড়া সুন্দর, একটা মেয়ে বললো, ‘দুল জোড়া খুলে ফেলো, প্রথমেই ক্লাস টিচার তাসকিনা ম্যাডামের ক্লাস। ম্যাডাম বকা দিবে। ‘ মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সখের ঝুলানো দুল খুলে ফেলতে হলো। পরে বুঝ বাড়াতে বুঝতে পেরেছিলাম, মেয়েটা দুষ্টু ছিলো। ম্যাডাম জীবনেও বকতো না। কি ভাবছেন? আমরা ছোটোকালে কি ভোলাটাইনা আছিলাম! এখনকার প্রজন্মও কোমলমতি। ওরাও সুন্দর হাসি দিয়ে ভুবন ভুলাতে জানে, ওরা আজো সুন্দর-উচ্ছল। সরকার যখন ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পরীক্ষা বাদ দিলো তখন আমি বললাম ‘আলহামদুল্লাহ’। আলহামদুলিল্লাহ কারণ, পাঠশালা হোক শিশুদের খেলার স্থল, মননশীলতা আর সৃষ্টিশীলতার জায়গা। আমাদের হাত ধরে ওরা ওদের কল্পনার জগতে প্রবেশ করুক। আজো বেঁচে থাকুক শৈশব, বেঁচে থাকুক মাসুম।

 

mareaz

আমি তো সব সময় হারিয়ে যাওয়া উল্টা পথের পথিক।

Leave a Reply