রহমান চাচা

রহমান চাচা।আজ তারই গল্প বলবো।এই এক চাচাই আছেন এলাকায়।একা একাই থাকতেন।ছেলেমেয়েরা সবাই লন্ডনে চলে গেছে আজ প্রায় দশটা বছর।কেউ একবারও আজ পর্যন্ত বুড়োটাকে দেখতে আসেনি।শুধু একজন চাকরই আছে যে কিনা তার দেখাশোনা করে।তার নাম মাহবুব।”মাবু” বলেই চাচা ডাকে।চাকর আছে ঠিকই কিন্তু কেউ এটা বলবেনা রহমান চাচার বয়স খুব একটা হয়েছে।তিনি নিজের খেয়াল নিজেই রাখেন।তিনি এখনও সেই পয়ত্রিশ বছরের যুবকই রয়েগেছেন। বয়স তাঁর যদিও ষাটের কোটায় তো হবেই। বুড়ো বললাম আমার আদর করে বুড়ো চাচা বলাটা স্বভাব হয়ে গেছে বললেই চলে।।

“প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে!সন্ধ্যা বেলা।জানলা বন্ধ করতে গিয়ে দেখি একটা গাড়ী এসে থামলো আমাদের এলাকায়।একটা ছাতা নিয়ে দৌড়ে গেল দাঁড়োয়ান। কাঁচের গ্লাসটা একটু মুছে দেখলাম গায়ে কোর্ট পড়া।বেশ ভদ্রলোক।পর্দা টেনে দিয়ে চেয়ারে বসতে যাবো,ঠিক তখনই কড়া নাড়ছে চাচা আপনার সাথে দেখা করতে এক সাহেব এসেছে।এইবার বুঝলাম আমাদের বাড়ীতেই এসেছে।

আমি বললাম তাকে যেনো বেশ খাতির-যত্ন করা হয়।আমি এখন একটু বিশ্রাম নেবো।দাঁড়োয়ান বলল, স্যার উনি আপনার সাথে কথ বলতে চায়,কাল সকালই চলে যাবেন।আপনার সাথে কথা বলাটা তার নাকি খুব দরকার।”
দরকার তো ওনার, আমারতো দরকার নেই।এতই যখন দরকার তাকে অপেক্ষা করতে বল!
ঠিক আছে স্যার আমি তাকে জানাচ্ছি।এই বলে চলে গেলো।
রহমান চাচা সত্যি বড্ড শক্ত মানুষ হয়ে গেছন।হবেই না কেন?সব দায় – দায়িত্ব তিনি একাই  সামলান!

দাঁড়োয়ান খাবারের ব্যবস্থা করলো।নানান রকম পদ তার জন্য করা হল।অতিথি শালা তার জন্য খুলে দেওয়া হলো।

রাত ১০টা বাজে।অতিথি কে খাইয়ে দেওয়া হল।অতিথি রহমান চাচার খোঁজ করছিল। মাবু বলল যে খাওয়ার পর আপনার সাথে দেখা হবে।এখন চাচা বিশ্রাম করছে।

ঘন্টা খানেক পরে চাচা অতিথিকে দেখতে যান।বললেন কেমন আছেন?খাওয়া দাওয়া করেছেন?বলতেই অতিথি কে দেখে চমকে গেলেন!বললেন সেকি বন্ধু তুমি?তুমি আমার ঠিকানা কোথায় পেলে?কতদিন পর দেখা বল?রহমান চাচা প্রশ্ন করেই চলেছে..
তাকে থামিয়ে এবার অতিথি বলল যাক চিনলি তাহলে?এত প্রশ্ন করলে উত্তর দিই কি করে বলত?
ওহ্ হহ্! দুঃখিত বন্ধু!কতদিন পর দেখলাম বল?আপনরা সেই কবেই ছেঁড়ে চলে গেছে।তোকে হঠাৎ দেখে বুকটা অাবেগে আবার পূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অতিথি”তা তো বটেই..!তা তোরছেলেমেয়েরা কি আর আসেনি?ওরা কি ওখানেই বসবাস করতে শুরু করে দিয়েছে?
হ্যা রে।তোর ভাবি যাওয়ার পর থেকে তো ওরা আর আসেই নি!আমার ওপর খুব রাগ! বুজলি?খুব রাগ!আমাকে ওদের সাথে করে আমেরিকা যেতে বলেছিল,আমি না করে দিয়েছিলাম।এখানে তোর ভাবির স্মৃতি কি করে যাই বলতো।

তো তুমি খোঁজ নিয়েছিলে?(বন্ধু)।না রে মামুন আমি খোঁজ নেই নি!আমার ওপর বড্ড অভিমান করেছে আমার বয়স হচ্ছে ওরা কি সেটা বুঝতে পারছে না?আমি কি রাগ করতে পারি ওদের সাথে বল?হ্যা, একটু অভিমান বাবা হিসেবে আমিওতো করতে পারি বল?

তা ঠিক বলেছিস!কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানতে পারতিস!ঠিক বলেছিস কতদিন হয়ে গেলো…আমার ছেলেটাকে দেখিনা!মেয়েটাকেও পাঠিয়েছিলাম বিলেতে পড়তে।ভাই বোন ভালো পাশ করেই জীবনে অনেক বড় হয়েছে।বড় ছেলেটা বিয়েও করেছে,তার একটা ছোট্ট বাবু ছিল!জানিস এইটুকু, এইটুকু আমার ছোট্ট দাদাভাই টা।আমাকে দাদ্দা দাদ্দা বলে ডাকতো।সবেমাত্র কথা বলা শিখছিল।সেও নিশ্চয় এখন অনেক বড় হয়েছে?

অতিথি চুপ।
কিরে মামুন কথা বলছিস না কেন?দাঁড়া তোকে আমি ওদের ছবি দেখায়।তারপর দৌড়ে ভেতর থেকে বেশ ক’টা ছবি আনলো।আর দেখিয়ে বলল দেখ আমার দাদুভাইটা এখনো মনে হয় সেই ছোটই রয়ে গেছে।দাঁত দুটো দেখ !

কি সুন্দর দেখতে!

একদম সেতুর মতন দেখতে!তাই না?
হ্যা তাই।একদম ভাবীর মতন দেখতে!
এই দ্যাখ আমার মেয়ে ওর বিয়ে খুব ধুমধাম করেই দিবো ভেবেছিলাম।কিন্ত ও ওর কোন এক বন্ধু কে ভালোবাসতো! এই নিয়ে ওর সাথে অনেক ঝগড়া হয়েছিল।বকাও দিয়েছিলাম।পরে আবার রাগ ভাঙিয়ে মেনে নিয়েছিলাম।কি করবো বল  একটাই মেয়ে,তাও আবার সবার ছোট!এই যে দেখছিস  আমার বৌমা! সে তো খুব ভালো একটা মেয়ে,সেতু খুব শক করে আমার ছেলেটার বৌ করে এনেছিল।ভারী মিষ্টি আর লক্ষী মেয়ে।

তুই ফোন করিসনি?

নারে মোবাইলটা সেদিন ভেঙে গিয়েছিল।নাম্বারটা মুখস্ত করিনি।পরে অফিস থেকেই জোগাড় করি

দাঁড়া ওদের একটা ফোন দেই।এতবার ফোন দেওয়ার পরও রিং হচ্ছে না!মনে হয় ভিষণ ব্যস্ত!

ভালো মানুষ গুলোর সাথেই বুঝি এমনটা হয় রে!ধরবেনা!ফোন আর ধরবেনা!

রহমান চাচা বলল-কেন বলতো?এমনটা কেন বলছিস?তুই কি জানিস তারা আমেরিকা যাওয়ার পথেই তাদের প্লেন ক্রাশ হয়!

রহমান চাচা চুপ!একদম চুপ!তার মুখ দিয়ে আর কোন কথা নেই!তিনি তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইলেন! আর তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল কিন্তু মুখে কোন আওয়াজ করলেননা।

মামুন সাহেব বললেন-তোকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।আমিই তোকে ওদের সাথে নিয়ে যেতে বলেছিলাম।তুই একা বলে।কিন্তু তোর সাথে আর দেখা করতে পারলামনা।ভিসা টা আটকে ছিল তাই এতদিন আসতে পারিনি।খবরটা আমি সেদিনই পেয়েছিলাম।তোকে কেউ জানায়নি তাহলে।যাক তুই আল্লাহ-র অশেষ রহমতে বেঁচে গেছিস বন্ধু! তা না হলে তোকেও হারাতাম।এই বলে মামুন সাহেব জড়িয়ে ধরল।তারপর আর কোন কথা বলেননি।সোজা ধীর পায়ে রুমে চলে গেলেন।তারপর সেতু চাচীর ছবির সামনে গিয়ে এক দৃষ্টিতে তার ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন!চোখ তার ছলছল করছিল!মনে মনে হয়তো ভাবছিলেন আর বলছিলেন সেতু আমি আজ বড্ড একা হয়ে গেলাম!

তারপর সকাল হল অতিথি চলে গেলো।যাওয়ার আগে শেষ বারের মতন বন্ধুকে আলিঙ্গন করলেন।আর এই প্রথম বার তার মনে হচ্ছে তিনি একা।তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন বিধায় বন্ধু।

এরপর রহমান চাচা মাত্র সপ্তাহ খানেক বেঁচে ছিলেন। একদিন সকাল বেলা তার ঘুম ভাঙছে না দেখে দাঁড়োয়ান ভাই ডাকতে গিয়ে দেখে তিনি শক্ত কাঠ হয়ে আছেন!

অনেকদিন দেখা হয় না চাচার সাথে।আজ পরীক্ষা শেষ!চাচাকে দেখেই আসি!মাবুু ভাাইকে জিজ্ঞেস করলাম রহমান চাচা কি আছেন?উত্তরে তিনি সব বললেন।তারপর রাতে মাবু ভাইকে বলেছিল খেয়ে ছিস?তুই এবার একা হয়ে যাবিরে।তোরও আর কেউ থাকলো না।এই বাড়ির দায়িত্ব তোকেই তো নিতে হবে?তোর বাবা মা বড্ড স্বাদ করে তোকে আমার কাছে রেখে গেছিল।এবার যা আমি একটু একা থাকতে চাই।তারপর পরই নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিল।তাকে যেনো মাবু ভাই ডিস্টার্ব না করে বলে দিল।তিনি একটু শান্তিতে ঘুমোতে চান অনেকদিন নাকি ঘুমাতে পারেননি।এই বলে মাবু ভাই কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো।

আমি সত্যি খুব কষ্ট পেলাম।আমাকে তিনি নিজের মেয়ের মতন স্নেহ করতেন।

তিনি একাকীত্ব টা আর সইতে পারেননি।সবার একে একে চলে যাওয়াটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেননা,যার কারণে তার পরিণতিটাও এমন হল।।তার এতদিন যে ভরসায় বেঁচে থাকাটা সহজ হচ্ছিল আজ তার সেই ভরসা টাও নিমিষেই কাঁচের গ্লাসের মতন ভেঙে গেল!!

এই ছিল রহমান চাচা র গল্পঃ)

nispriho

আস্সালামুয়ালাইকুম। # Chittagong. #স্টুডেন্ট#ভালো লাগলেও জানান না লাগলেও কমেন্টে জানান#মানুষ মাত্রই ভুল#ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী 👧

১০ thoughts on “রহমান চাচা

  • মার্চ ১৮, ২০১৯ at ৮:০২ অপরাহ্ণ
    Permalink

    ঘটনাটি পড়ে অনেক ভালো লাগল

  • মার্চ ১৮, ২০১৯ at ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
    Permalink

    ধন্যবাদ!শুনে ভালো লাগলোঃ) #md samad

  • মার্চ ১৮, ২০১৯ at ৯:১৩ অপরাহ্ণ
    Permalink

    সুন্দর উপস্থাপন।

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    অনেক সুন্দর ছিল, উপস্থাপনও অনেক সুন্দর হইছে।

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ১২:৩৭ অপরাহ্ণ
    Permalink

    হা হা ধন্যবাদ #vai

  • মার্চ ২১, ২০১৯ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    আপনার গল্প গুলো সত্যি হৃদয় ছুয়ে যাওয়ার মত। কিন্তু সবার মত কেন জানি উপস্থাপনাটা আমার কাছে ভাল লাগছে না। আর বানান গুলোতে ভাল নজর দিতে হবে। আপনি উপস্থাপনার জন্য হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর বই পড়তে পারেন। উনার উপস্থাপনায় বাস্তবতা আছে।

  • মার্চ ২২, ২০১৯ at ৮:৩০ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    ধন্যবাদ আপনাকেঃ)চেষ্টা করছি!!#sarwar

  • মার্চ ২৮, ২০১৯ at ১১:০৮ অপরাহ্ণ
    Permalink

    হুমায়ূন আহমেদ স্যার ইমাজিনেটিং ছিলেন। তিনি তার ইমাজিনেটিং পাওয়ারকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি তার কল্পনাকে কলমের ডগায় নিয়ে এসেছিলেন।

Leave a Reply