নেতিবাচক ও নেতিবাচকতা এবং আমরা

নেতিবাচক কি? নেতিবাচকতা কি? নেতিবাচক-ইতিবাচক কি আমাদের চিন্তা-ভাবনার সাথে জড়িত? পক্ষপাতদুষ্ট (biased) দৃষ্টিভঙ্গির পিছনে কি নেতিবাচক-ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা দায়ী? আমরা কি চাইলেই আমাদের পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?

‘মেয়ে কি সুন্দর?’ ‘মেয়ে কি ফর্সা?’ ‘মেয়ে কি লম্বা?’

‘ছেলে কি করে?’ ‘কতো টাকা বেতন?’ ‘বাড়ি-গাড়ি আছে?’

আমার বুঝে এখনো আসে নাই, বিয়ের সাথে এই বিষয়গুলোর সম্পর্ক কতোটা যুক্তি সংগত? মেয়ে সুন্দর কিনা এটা সবার প্রথমে মহিলারাই জিজ্ঞেস করে। ছেলে-মেয়ে আসলেই সমঝোতা(compromise) করতে পারবে কিনা, একে অপরের প্রতি অনুগত(loyal) থাকবে কিনা এটা নিয়ে বেশির ভাগ আত্মীয়-স্বজনের মাথা ব্যাথা নাই। যদি পরীর মতো সুন্দরী মেয়ে চান তাহলে দেখেন আপনার ভাইয়ের/ভাগ্নের জন্য আকাশ থেকে কোনো পরী নেমে আসে কিনা। এই দেশে বিয়ে দিতে চাইলে এভারেজ বিউটিই পাবেন। আর টাকা-পয়সা যদি আসল ব্যাপার হয়, তবে মেয়ের জন্য একেবারে বিল গেটসকে ধরে নিয়ে আসুন। যখন আমরা জানছি বিয়ের ব্যাপারে এই বিষয়গুলোকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রথমে খোঁজাটা অতিরিক্ত ভাঁড়ামি এবং কম্প্রমাইজ ও আনুগত্যের বিষয়টা প্রধান তবে আমরা কেন এই বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দিচ্ছি? আমরা কেন যুগে যুগে সমাজের এই বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গির কাছে নেজেদের সঁপে দিচ্ছি? এখন আপনারা আবার বলবেন ইউরোপিয়ান কান্ট্রিগুলোই ভালো। বিয়েতে এতো ঝামেলা নাই। ওরা নিজেদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। হ্যা, সব কিছুরই খুঁটিনাটি(pros n cons) আছে। ওরা ওদের পছন্দমতো লিভিং রিলেশনে যায় কিন্তু প্রতিশ্রুতি(commitment) খুঁজে পায় না। ওরা ওদের মনের কথা বলার জন্য নিজের মা-বাবাকেও খুঁজে পায়না। তখন ওরা আমাদের দেশে চলে আসে প্রতিশ্রুতি আর সম্পর্কের বন্ধন দেখতে আসে। ওরা এখানে আসে শেকড়ের সন্ধানে। হ্যাঁ, আমাদের বিয়ের ক্ষেত্রে ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই’ তবে আমাদের সম্পর্কে সেই বন্ধন আছে। যাই হোক, সব সম্পর্কেরই একটা নিজস্ব গতি আছে। সম্পর্কগুলোকে বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপরে উঠাতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে নারীরা কতোটা এগিয়ে? পৃথিবীতে কি আদো মহিলা বান্ধব পরিবেশ(women friendly environment) আছে? পৃথিবীর কোথাও নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। বরঞ্চ তৃতীয় বিশ্ব হিসেবে বাংলাদেশে নারীদের সামাজিক ও  অর্থনৈতিক অগ্রগতি আজ প্রশংসার যোগ্য। প্রতিবেশী দেশগুলোর চাইতেও বাংলাদেশে নারীরা বেশি সম্মানিত। তবুও যদি আপনার মনে হয় নারীরা এখনো বঞ্চনার শিকার তবে আমার জানা মতে, জাপানে নারীদেরকে চাকরিতে উপরের পোস্টে কখনো দেয়া হয় না, আমেরিকাতে আজো নারী প্রেসিডেন্ট দেখা যায়নি, উঃ কোরিয়ায় নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যৌন নির্যাতনের(sexual harrassment) স্বীকার হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে নারীরা সবজায়গায় অভিযোগ করতে থাকে তাদেরকে দুর্বল ভাবা হয় এবং তারা নিজেদের সামনে আনার সুযোগ পাচ্ছেন না। নিজেকে সবসময় ভিক্টিম প্রমাণিত করবেননা। আপনি যেখানেই যান সেখানেই গিয়ে নিজেকে ভিকটিম অভিযোগ করতে থাকলে কেউ হয়তোবা আপনাকে কিছু বলবে না, কিন্তু আপনি নিজেকে immatured প্রমাণ করলেন। আবার, অনেক পুরুষ অভিযোগ করতে থাকে মহিলাদের জন্য পথটা সোজা, আপনারা মেয়ে-মানুষ আপনাদের এতো ঝামেলা নাই। এরকম অভিযোগে কেউ হয়তোবা আপনাকে কিছু বলবে না, কিন্তু আপনি নিজেকে immatured প্রমাণিত করলেন। কারোর জন্যই পথটা সহজ না। পথটাকে মানানসই(manageable) করে নিতে হয়। নিজেদের মধ্যে পার্থক্য না করে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক হয়ে চলাটাই কাম্য।

এবার আস্তিক কি? নাস্তিক কি? এই আস্তিকতার-নাস্তিকতার সম্পর্ক কি ধর্মে বিশ্বাসের সাথে জড়িত? ধর্ম, জাতি, বর্ণ আসলেই কি বিতর্কিত(controversial) ইস্যু? না, এগুলো কখনোই বিতর্কিত বিষয় ছিলো না। আজ আমরা বলতে পারবো না ধর্ম, জাতি, বর্ণ বিতর্কিত বিষয় নয়। আর কারা, কি উদ্দেশ্যে বিতর্কিত করেছে তা আমাদের সবারই জানা। আজ আমরা আস্তিক-নাস্তিক প্রশ্নে বিবাদে জড়াচ্ছি। ধর্মে বিশ্বাসে আমাদেরকে মারমুখো অবস্থানে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আমাদের বিশ্বাসকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। যাদেরকে আমরা বেশি ধর্মের নিয়ম-কানুন তার প্রাত্যহিক জীবনে মেনে চলতে চায় আমরা কিছু না বুঝেই তাকে মৌলবাদী বলি। মৌলবাদ কি তা হয়তোবা আমরা জানিই না। মাদ্রাসায় পড়েছেন বলে একজন কট্টর মৌলবাদী নাও তো হতে পারে। হতে পারে সে সুফি বেশে একজন স্কলার আধুনিক মনের মানুষ। আবার অনেকেই থাকতে পারেন যাদেরকে দেখলে বোঝা যাবে না সে ধার্মিক, হতে পারে সে মন প্রাণ থেকে ধার্মিক। অনেকক্ষেত্রে দেখা যাবে, কেউ সারাদিন ইবাদাত করে গেলো কিন্তু তার দোয়া কবুল হলো না,  কিন্তু যে কিনা অনেক দ্রুত এবাদাত করে কিন্তু তার দোয়া কবুল হয়ে যায়। মনটা পরিষ্কার হওয়া দিয়ে কথা। কার মনে কি আছে এটা তো আল্লাহই ভালো জানেন। আবার, ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা থাকতেই পারে। ভ্রান্ত ধারণা আছে বলেই সে নাস্তিক এটা তো নাও হতে পারে। পর্দা করাতে এবং ধর্মের সব বিধি নিষেধ মেনে চললে অনেকেই ভুল ভাবেন তিনি ধর্মের গেঁড়াকলে বাঁধা পড়বেন। তাই বলে যে সে নাস্তিক এটা তো নাও হতে পারে, হতে পারে তার বোঝার ভুল। আমাদেরকে কাউকে সরাসরি নাস্তিক আখ্যা দেয়ার আগে নাস্তিক, কাফের, মুনাফেক, মুশরেকের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।

তুমি আমার মতো নও, তাই আমিই সঠিক তুমি বেঠিক এটা তো নাও হতে পারে। সবাই তো আর এক নয়। হ্যাঁ, আমরা সবার মন কোন না কোনোভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। আমাদের উচিত সবকিছুকে একতরফা না দেখে ব্যাল্কনি ভিউ থেকে দেখা। সব ঘটনাকে উভয় পাশ থেকে দেখে বিচার বিশ্লেষণ করা। আমরা কি আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে আরো উদার করতে পারি না? আমরা কি নিজেদের বাঁকা দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্বে নিতে পারিনা?

mareaz

আমি তো সব সময় হারিয়ে যাওয়া উল্টা পথের পথিক।

৬ thoughts on “নেতিবাচক ও নেতিবাচকতা এবং আমরা

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    সুন্দর লিখেছে, লিখার বিষয়টি অনেক ভাল।

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ১২:১৮ অপরাহ্ণ
    Permalink

    ধন্যবাদ আপনাকে।

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ১:৪৪ অপরাহ্ণ
    Permalink

    অনেক ভালো লিখেছেন। আশা করি লেখাটি কিছুটা হলেও আমাদের সমাজকে প্রভাবিত করবে।

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ৭:৫২ অপরাহ্ণ
    Permalink

    আপনার সুচিন্তিত মতামত দেবার জন্য ধন্যবাদ।

  • মার্চ ১৯, ২০১৯ at ১০:২৯ অপরাহ্ণ
    Permalink

    নিজের ভিও টাই হচ্ছে মুখ্যম!সমাজটা সুন্দর করতে হাজার জনের দরকার নেই!প্রতি পরিবার থেকে একজনই যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা পালনে।👍

  • মার্চ ২১, ২০১৯ at ২:৩৭ অপরাহ্ণ
    Permalink

    ঠিক @nispriho। তবে আমরা কিছু মানুষকে সাহায্য করতে পারি তাদের দৃষ্টিকোণ বদলাতে।

Leave a Reply